স্বগতোক্তিতে স্বাগতম! ব্লগটি মূলত ওপেন সোর্স, বইপত্র আর অন্যান্য বিষয় নিয়ে। কোনো মতামত থাকলে কমেন্ট কিংবা ই-মেইল করতে ভুলবেন না।

লাইফ প্রজেক্ট ০০২


আর কিছুক্ষণ যদি নাইলসের “Forever the eyes” শুনতাম নিশ্চিত মৃত্যু হতো আমার। আবারো ডিপ্রেশন এ্যাটাক? অথচ, সমস্ত কিছুই গোছানো ছিলো ওই লাইফ:০০২ ভার্শনটায়। হুটহাট আমার মেজাজ খারাপ হতো। একটা একাকী জীবন, বাজে অবন্ধুসুলভ একটা পরিবার। বন্ধুবান্ধব যারা আছে, পুরোদস্তুর আবর্জনা। আমি বারবার কমান্ড সেন্টারে জিজ্ঞাস করতাম এইখানে কেনো আমাকে রাখা হলো, এবং কেনো এখানে পাঠানোর আগে আমার মতামত নেয়া হলো না.. ওরা শুধু বলতো তারা ক্ষমতাহীন এবং লাইফ মড্যুলের প্যারেন্ট ভূমির সাধারণ সদস্যদের উপর যে নিয়মগুলো খাটে, আমি তার বাইরে পড়ি। কারণ, আমি একটা রিসার্চ প্রজেক্টের অংশ ও সম্ভাবনাময় একজন মানুষের ক্লোন। আমি চাইলেই যেকোনো কিছু করতে পারি, কিন্তু আমি কেনো তা করছি না- তা জানাই তাদের রিসার্চের অংশ। আমি কি করতে চাইছি, এবং কি করছি না, তা জানতে চাইলে বলতো- তুমি নিজে সমাধান করো। যদিও আমার মনে হতো, আমি সমাধান করতে পারছি না, অনেক চেষ্টা করার পরও। তবে মাঝে মাঝে টের পেতাম ওদের সিস্টেম পুরোপুরি সাউন্ড নয়। কারণ আমার মতো অনেক ক্লোন (বিশেষত কণিকা) আমার সাথে ওদের অগোচরে যোগাযোগ করতো এবং হিন্ট দিতো আমি কি কি করলে এই লাইফ-০০২ প্রজেক্টের সব বাউন্ড টপকে বেরিয়ে আসতে পারবো। ওর দেয়া হিন্টগুলোর মাঝে সবচেয়ে দরকারী টি ছিলো- আমরা ক্লোন রা “লাইফ প্রজেক্টের” বিভিন্ন ভার্শনে আটক আছি; কারণ সব ভার্শনেই আমাদের একটা করে প্রবলেম সলভ করতে হবে।     সেই প্রবলেম গুলো সলভ করার জন্য এক বা একাধিক টুলস আমাদের ভার্চুয়াল লাইফে আছে এবং সব বাঁধা ডিঙিয়ে সেগুলো আমাদের প্রথমে হাত করতে হবে ও সর্বশেষে তা সলভ করতে হবে। “সলভ করার পরই তুমি আত্মহত্যা করবে, তোমার এলগোরিদম যেন কখনোই কমান্ড সেন্টার না জানতে পারে। আত্মহত্যা করলে তোমার দেহাবশেষ কে মহাশূন্যে পাম্প করে দেয়া হবে প্রজেক্টের ডাস্ট সেকশন থেকে। ডাস্ট সেকশনে ক্লোন হিউম্যানদের এজেন্ট আছে। ওরা তোমায় রক্ষা করবে এবং রিস্টোর করবে।” আমি কনিকাকে বহুবার জিজ্ঞেস করেছি, আমাকে এইসব জানিয়ে তার কি লাভ। সে বলেছে, ক্লোন হিউম্যান রা লাইফ প্রজেক্টের সীমানা ডিঙিয়ে বিদ্রোহের প্ল্যান করছে এবং যত বেশি ক্লোন রা জমা হবে ততই তাদের জন্য ভালো। আমি ইদানীং লাইফ-০০২ এর ভেতরে সব ক্লান্তি ঝেঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছি। আমার পূর্বধারণা বলে, (সব ক্লোনদেরই তার প্রথম প্রজন্মের পূর্বধারণাগুলো অর্জিত হওয়ার প্রযুক্তি থাকে) সুস্থ থাকার জন্য বাছবিচারহীন হতে হয় এবং যা আপাতঅর্থে তোমার ভালো লাগে না তাও করতে হয়। একইসাথে উদ্ভটদর্শন নানান এটা-ওটায় হাত দিতে হয়, কারণ এতে নাকি অনেক নমুনা থাকে প্রবলেম সলভ করার এলগোরিদমটির। “এই প্রবলেম সলভ করিয়ে ওদের কি লাভ?” আমি আমার মতো আরেক ক্লোন রাফাতকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বললো, প্যারেন্ট ভূমির সদস্যরা নানান ঝুঁকিপূর্ণ সাইকোলজিক্যাল সমস্যার সমাধান করতে এটা চালায়, যেহেতু তারা নিজে করতে ভয় পায়, তাই এসব ক্লোনদের দিয়ে করানো হয়।     রাফাত, কণিকা এরা কাছাকাছি টাইমলাইনের লাইফ প্রজেক্টের একটা ভার্শনে অবস্থান করছে। “কতটা কাছাকাছি?” এমন জিজ্ঞেস করতে ওরা একদিন বলেছিলো, ওদের ভার্শনে ওরা খুব ছোটো ছোটো সংকেতে হালকা লেখাপড়া করতে পারে এমন একটা অবস্থায় আছে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, “এটা তো খুবই আদিম অবস্থা, তোমাদের তো এমনকি কম্পিউটারও নেই, লাইফ প্রজেক্ট হ্যাক করলে কিভাবে?” ওরা জানায়, ওদের মিথে একটা নিষিদ্ধ এলাকা আছে, ওখানে একদিন ওরা কিছু অদ্ভুত চারকোণা স্বচ্ছ জিনিস দেখতে পায় যা থেকে আলো বেরুচ্ছে। রাফাত তাতে গুতোগুতি করছিলো কিছু সপ্তাহ- সেখান থেকে হঠাৎ সে কন্ঠ শুনতে পায়। রাফাত ভেবেছিলো, দেবতার কন্ঠ, বোধহয় তাকে বাণী দিচ্ছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে এটা আসলে তার মতো আরেকজন মানুষের কন্ঠ এবং সে গোপন কিছু জানাতে চায়। সেই চারকোণা যন্ত্রটিতে অপর একজন ক্লোন তাকে নানান নির্দেশনা পাঠাতে থাকে যাতে সে লাইফ প্রজেক্টের দুর্বল ব্রীজগুলোতে অন্য ক্লোনদের সাথে যোগাযোগ করে ও প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়। “কিন্তু এই যন্ত্র এত প্রাচীণ ভার্শনে কেনো রাখা হলো?” আমি এমন প্রশ্ন করলে রাফাত জানায় এটা আসলে রিসাইক্লিং করার জন্য হয়েছে। প্যারেন্ট ভূমির প্রজেক্টটা সম্ভবত নাজুক অবস্থায় আছে এবং ওদের রিসোর্স ফুরিয়ে এসেছে, তাই একই ভার্চুয়াল লাইফ বারবার ব্যবহার করছে। আমি কিছু অজানা কারণে হঠাৎই কয়েকদিন খুব উদ্দীপনা অনুভব করছি। চিরদিনই গতানুগতিক রোমান্টিক সম্পর্কগুলোয় নাক সিটকে আসা আমি হঠাৎ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আগ্রহও দেখাচ্ছি।     এবং টের পেলাম আমি আমার সংস্কারের সীমা ছাড়িয়ে একটা রোগাপটকা মেয়ের সাথেও সময় কাটাচ্ছি। সম্ভবত এর কারণ, কোনো উদ্দীপনার রাসায়নিক আমার রক্তে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে, ক্লোনরাও কোনো কারণে ইদানীং অনেক সজাগ। আমাকে বলা হয়েছে আমি যেন আমার কম্পিউটারে সবসময় চোখ রাখি, এবং বিদ্যুতে সংযুক্ত রাখি। যদিও আমি কম্পিউটার পছন্দ করি না, এবং একেবারেই বাজে লাগে। ওরা বলেছিলো “তোমার নিজ থেকে কিছু করতে হবে না, তুমি তোমার পার্সোনাল কম্পিউটারকে পাওয়ার অন করে শুধু স্ক্রীণের দিকে তাকাবে এবং ভান করবে বোতাম চাপার, বাকি কাজ তোমার ভেতরের ক্লোনই করে দেবে, তুমি একজন গণিতবিদের ক্লোন।” আমিও রুটিনমাফিক সেটাই করে যাচ্ছি। আর লাইফ প্রজেক্টে বোধহয় রেইড চালানো হয়েছিলো, এটাই ক্লোনদের সজাগ হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে। সম্ভবত কোনো ছুটির দিন, যেদিন আমার রোগাপটকা মেয়েটার সাথে বাইরে যাওয়ার প্ল্যান থাকে। আমি কিছুটা খুশি থাকি। ব্যাকপ্যাকে আমি সবসময়ই পার্সোনাল কম্পিউটার টা রাখি। আমি জানি না হঠাৎ কেমন উদ্ভ্রান্ত অনুভব হচ্ছিলো, যেন যে ইকুয়েশনটার তল খুঁজে পাচ্ছিলাম না সেটাই এবার পেয়ে গেলাম। যদিও আমাকে বলা হয়েছে আত্মহত্যা করতে এলগোরিদমটি পাওয়ার পর। তবুও আমার মনে হলো, একবার আমার প্রেমিকাকে এই আবিষ্কারের খবরটা না জানিয়ে মরে যাওয়াটা ঠিক হবে না। আমি ওকে বাসায় আমন্ত্রণ জানালাম। একইসাথে বিদায়টাও নিয়ে নেবো।     আমরা অনেকক্ষণ কথা বললাম আমার দোতলার খোলা ছাদে বসে। সারাদিন বৃষ্টি ঝড়ে আমার ছাদের ক্যাকটাসগুলো চকচকে হয়ে উঠেছিল। যদিও ঘোলাটে চাঁদ উঠার কথা, কিন্তু আমাদের সামনে খুবই উজ্বল একটা চাঁদ উঠলো। আমি আবিষ্কারের কথাটা বললাম, কিন্তু কোনোভাবেই বিদায় নেয়ার প্রসঙ্গটা তুলতে পারছিলাম না। হঠাৎ মনে হলো, “যা বলেই ফেলি !” শুরু করলাম.. “শুনো তুলি, আমার আসলে আজকের পর আর তোমার সাথে দেখা হবে না।” তুলির ততক্ষণে হাসতে হাসতে পড়ে যাওয়ার দশা। নির্ঘাত ফাজলামি ধরে নিয়েছে কথাটাকে। আমি ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করছি না কেনো জানি। আমার মনে হতে লাগলো, আমি এতদিন এই সম্পর্কটাকে যতই নিয়ম পালনের মনে করি না কেনো, এখন আমি এটা নিয়েই দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। এবং,মনে হচ্ছে আমার শোবার ঘরের ইলেকট্রিকে শক খেয়ে মারা যাওয়ার থেকেও দরকারী তুলির সাথে থাকা। এর মানে আমি আত্মহত্যা করতে পারছি না এবং কমান্ড সেন্টারের লোকেরা আমার এলগোরিদম টা নিয়ে যেয়ে আমাকে আর রিস্টোরও করবে না। “আমি একটু আসছি।” বলে আমি বেডরুমে গেলাম। এবং সাধারণ ভোল্টেজের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়িয়ে রাখা মেশিনটায় হাত ঢুকিয়ে দিলাম। মৃত্যুযন্ত্রণা হলো না বললেই চলে। ক্লোনদের দেয়া কথা মতো ডাম্প সেকশনে আমাদের এজেন্ট আমাকে পাম্প না করে রিস্টোর করলো। আমি নিজেও বহুদিন প্যারেন্ট ভূমিতে এজেন্টের কাজ করলাম। একদিন আমাদের মুক্তিও এলো। ক্লোন রা প্যারেন্টভূমির ক্ষমতায় এলো। সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা হলো। আমি প্রায়ই ভাবি, কোনটা ভালো ছিলো- তুলির সাথে লাইফ-০০২ এ আমার করা সেই ক্লোনের চরিত্র নাকি এখনকার অবসরপ্রাপ্ত একজন ক্লান্ত এজেন্টের জীবন। আমি জানি দুইটাই দরকারী, তার চেয়েও বড় কথা আমি প্রায়ই এখন তুলির সাথে লাইফ-০০২ এর ভার্চুয়াল লাইফে দেখা করে আসি। ওর সাথে কাটানো প্রিয় সময়গুলি রিওয়াইন্ড করি আর মাঝে মাঝে এখনকার প্রেমিকাকেও এসবের গল্প বলি।          

এই লেখাটি Creative Commons এর CC BY-NC-ND 4.0 CCBY4 এর অধীন। আপনি লেখাটি অবিকল সংস্করণে শর্তসাপেক্ষে প্রকাশ করতে পারেন, তবে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার বা প্রকাশ করতে পারেন না। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য লেখকের অনুমতি নিন। প্রাথমিক শর্ত: আপনাকে অবশ্যই লেখাটি লেখকের নাম সহ প্রকাশ করতে হবে। লেখাটি যেনো কোনোভাবে পরিবর্তিত বা বিকৃত না হয় লক্ষ্য রাখতে হবে। বিস্তারিত দেখুন এখানে